বৃহস্পতিবার, ২০ Jun ২০১৯, ০৬:৫৮ পূর্বাহ্ন

বেঁদে সম্প্রদায়ের বিচিত্র জীবন, ওরাও মুসলমান, মুসলমানদের মতোই নামাজ, রোজা, ঈদ উদযাপন করে থাকে

বেঁদে সম্প্রদায়ের বিচিত্র জীবন, ওরাও মুসলমান, মুসলমানদের মতোই নামাজ, রোজা, ঈদ উদযাপন করে থাকে

শরীয়তপুর টাইমস ডটকম ডেস্ক ॥ শরীয়তপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেঁদে সম্প্রদায়ের বিচরণ রয়েছে। শরীয়তপুর সদর উপজেলার কোটাপাড়া, রাজগঞ্জ, আংগারিয়া, মনোহরবাজার, বুড়িরহাট, নড়িয়া উপজেলার নড়িয়া সদর, বিঝারী, ভোজেশ্বর, ডিংগামানিক, ঘরিসার, পন্ডিতসার, চাকধ, চন্ডিপুর, সুরেশ্বর, ওয়াপদা, ভেদরগঞ্জ উপজেলার কচিকাটা, চরসেনসাস, দুলারচর, কার্ত্তিকপুর, রামভদ্রপুর, মহিষার, ছয়গাঁও, সাজানপুর, ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর. ধনই, পূর্ব ডামুড্যা, সিধলকুড়া, গোসাইরহাট উপজেলার নাগেরপাড়া, ইদিলপুর, কোদালপুর, ধীপুর কালিখোলা, সামন্তসার, জাজিরা উপজেলার নাওডোবা, বিলাশপুর, কুন্ডেরচর এলাকায় বেঁদে সম্প্রদায়ের বসবাস লক্ষ করা গেছে। এসব এলাকায় প্রায় ৩ হাজার বেঁদে পরিবার রয়েছে। বেঁদেদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এসব বেদের অধিকাংশই মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের অধিবাসী ছিল। জরিনা বেগম (৫৩), স্বামীর নাম ছমেদ সরদার, গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে। বর্তমান ২ ছেলে ১ মেয়ে নিয়ে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা সদরের ডাঃ গোলাম মাওলা ব্রীজের উত্তরপােেশর নদীর পাড়ে ডেরা ঘরে করেন। অক্ষরজ্ঞান শুন্য, জাতিতে মুসলমান, পেশায় বেঁদে জরিনা বেগম গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাপ খেলা দেখানো এবং সিংগা দিয়ে মানুষের নাভীতে লাগিয়ে পেটের ব্যঁথা ভালো করা ও দাঁতের পোকা ফেলানোই তার কাজ। যা পান তা দিয়েই সংসার চালান। কথা হলো তার সাথে। তিনি জানান, পদ্মা নদী ভাঙ্গনের ফলে এসব লোকজন ভূমিহীন হয়ে পড়ে এবং এক সময় নৌকায় বসবাস শুরু করে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় তারা। প্রচলিত রেওয়াজ মতে, ওরা বেঁদে, ওরা যাযাবর। বিচিত্র ওদের জীবন। ভেসে বেড়ায় নদীতে। আজ এখানে তো কাল ওখানে। তাই ওদের জীবনযাত্রাই আলাদা। গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে সাপ বানরের খেলা দেখানো আর গাছগাছড়ার শিকড়, তাবিজ কবচ বিক্রি করাই ওদের প্রধান কাজ। একই কথা শুনালেন বেঁদে সম্প্রদায়ের অপর রমনী শাফিয়া আক্তার ও জরিনা আক্তার। তাদের বর্ণনা মতে, বেঁদে পরিবারের শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পুঁথিগত শিক্ষার ধার ধারে না ওরা। ওরা শুধু পেট ভরে দু’মুঠো ভাত আর মোটা কাপড় পরে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে চায়। নদীর পাড়ে কিংবা মাঠের ধারে ছোট ছোট ডেরা তৈরি করে দলবদ্ধভাবে ওরা বসবাস করে। বেঁদেরা এক জায়গাঁয় কখনও স্থায়ীভাবে বসবাস করে না। প্রতিটি দলে একজন করে সর্দার বা দলপতি থাকে। সর্দারে কথা কেউ অমান্য করে না। ওদের কারো সাথে কোন ঝগড়া ঝাটি হলে সর্দার তার মীমাংশা করে থাকেন। সর্দারের বাইরে কেউ কোন কথা বলেন না। ওদের অপরাধের জন্য কোন মামলা আদালতে গড়ায় না। সর্দার যা বলবে সেটাই ওদের জন্য আইন। এমনকি সর্দারের অনুমতি ছাড়া ওদের সন্তানদের নাম রাখা, বিয়ে-শাদি দেয়া এবং থাকার স্থান নির্ধারন কল্পনাই করা যায় না। বিচার আচারে সর্দারের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত। এটিই তাদের আদালত। ঝগড়া ঝাটি মারামারি হলে কখনই তারা থানা পুলিশের শরনাপন্ন হয় না। প্রত্যেক বেঁদে বহরে সর্দারের আদেশ প্রতিপালিত হয় অক্ষরে অক্ষরে। কোন অসুখ হলে তারা নিজেরাই চিকিৎসা করে। ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে অথবা পানি পড়ার মাধ্যমে তা চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।
বেঁদেরা আত্মবিশ্বাসী এবং কর্মঠ। নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করে সংসার চালায় । তবে এ সম্প্রদায়ের ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি কর্মঠ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েরা উপার্জন করে। আর ছেলেরা ঘর সামলায় এবং আনন্দ ফুর্তি করে বেড়ায়। শিশুকে বুকে নিয়ে সারাদিন মনোহরী দ্রব্য, সাপ ও বানরের ঝাঁপি নিয়ে বের হয় বেঁদে মেয়েরা। দিন শেষে কর্মক্লান্ত দেহ নিয়ে ফিরে ঘরে। স্বামীরা হাটবাজারে গিয়ে সাপের খেলা দেখায় বানর নাচায় ও গাছগাছড়ার শিকড় ও তাবিজ বিক্রি করে। কোন কোন বেঁদের জমিজমা না থাকলেও তাদের মোটা অংকের টাকা পয়সা আছে।
এক স্থানের বেঁদেদের সাথে অন্য স্থানের বেঁদের যোগাযোগ আছে। তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। হয় বিয়ে শাদি। বিয়েতে আনন্দ ফুর্তি করতেও দেখা যায় ওদের। ওরা যখন যেখানে থাকে তখন সেখানেই ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে। নতুন স্থানে বসবাস গড়ে তুললেও এতটুকু বিরক্ত নেই ওদের। শীতকালীন অতিথি পাখির মত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে জীবিকার সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় ওরা। সর্দারের হুকুম হলেই আবার উধাও হয়ে যায়।
বেঁদেরা জানায়, তাদের বিয়ে-শাদি বেঁদে সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েদের সাথেই হয়ে থাকে। মুসলমান হল্ওে তাদেরকে সমাজের লোকজন একটু ঘৃনার চোখে দেখে বলে জানান তারা। অন্যসব মুসলমানদের মতই তারা নামাজ রোজা করেন ও ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর উদযাপন করে থাকেন। তারা মাছ মাংস মুসলমানদের মতই খেয়ে থাকেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




উন্নয়ন সহযোগীতায়ঃ- সেভেন ইনফো টেক
error: কপি করা দন্ডনীয় অপরাধ,যে কোনো প্রয়োজনে কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করুন।